সাইকোসিস (Sycosis)
সোরাজনিত মূত্রনলী হইতে গণোরিয়ার ন্যায় যে স্রাব হয়, তাহা দূষিত নহে।
সাধারণ প্রকারের স্রাব কোন কিছুর দ্বারা লুপ্ত করা হইলে ধাতুগত কোন দোষের সৃষ্টি হয় না।
গণোরিয়া ব্যাধিগ্রস্ত কোন স্ত্রীলোকের সহিত সহবাস না করিলে প্রকৃত গণোরিয়া সৃষ্টি হয় না। সুতরাং গনোরিয়া গনোকক্কাই (gonococci)-এর তরুণ সংক্রমণ। সহবাসের ৫ হইতে ১০ দিনের মধ্যে সর্ব প্রথমে মূত্রনালীর প্রদাহ দেখা যায়।
দূষিত গণোরিয়া যদি সদৃশ বিধানমতে চিকিৎসিত হয়, তাহা হইলে কোন কুফল হওয়ার সম্ভাবনা নাই। প্রকৃত গণোরিয়ার স্রাব যতদিন চলিতে থাকে, ততদিন ধাতু বিকৃতির কোন সম্ভাবনা নাই।
কদাচিৎ দৃষ্ট হইলেও গামছা, পরিধেয় বস্ত্র এবং শয্যার চাদর হইতে গণোরিয়া নিরীহ ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চারিত হয়।
আঘাত হইতে, শ্বেতপ্রদর অথবা জরায়ু হইতে তীব্র প্রদর স্রাব নিঃসৃত হইলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে গণোরিয়ার ন্যায় এক প্রকার সামান্য ধরনের মূত্রনালী প্রদাহ দৃষ্ট হয়। এই প্রকার সামান্য প্রদাহ সীমাবদ্ধ স্থানে থাকে এবং ইহার জন্য ধাতু বিকৃতির কোন সম্ভাবনা নাই।
অনেক সময় কঠোর পরিশ্রম, দীর্ঘদিন রাত্রি জাগরণ, অধিক মসলাযুক্ত খাদ্য আহার, রৌদ্র ভোগ ইত্যাদি কারণে মূত্রপথে জ্বালা ও সামান্য স্রাব আসিতে পারে। কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করিলে বিনা চিকিৎসায় বা উহার সহিত ২।৪ মাত্রা হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবনে নির্দোষ আরোগ্যলাভকরে।
উক্ত লক্ষণগুলি অসদৃশ বিধানে চিকিৎসিত হইলেও রোগীর পক্ষে তাদৃশ ক্ষতিকর হয় না।
কিন্তু প্রকৃত প্রমেহ বা গণোরিয়াক্রান্ত রোগীর পরিধেয় বস্ত্র পরিধান করিলে, বা তাহার সহিত একই শয্যায় শয়ন করিলে বা ঐ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যেস্থানে প্রস্রাব করে সেই স্থানে বসিয়া প্রস্রাব করিলে প্রকৃত গণোরিয়ার লক্ষণ আসিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গনোরিয়া গনোকক্কাই (gonococci)-এর তরুণ সংক্রমণ "গনোরিয়া" এর উপযুক্ত চিকিৎসা না হইলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেরও স্থায়ী সাইকোসিস দোষের সৃষ্টি হয়।
যেস্থানে বহু ব্যক্তি প্রস্রাব করে সেখানে বসিয়া প্রস্রাব করা কখনও সঙ্গত নহে। মূত্রযন্ত্রের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীর সংস্পর্শে আসিলে বিপদের সম্ভাবনা ঘটে। অপরিচিত স্থানে বা হোটেলে বালিসের ঢাকনা বা বিছানার চাদরে শয়ন করাতেও বিপদের সৃষ্টি হইতে পারে। অবশ্য হোটেলে বা হাসাপাতালে সর্বদাই প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সদ্য কাচান চাদরই ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। তথাপি সর্বদাই নিজের গামছা, বালিসের ঢাকনা ও বিছানার চাদর ব্যবহার করা (হাসপাতালে সম্ভব নহে) নিতান্ত কর্তব্য।
সাধারণতঃ গোপনে অবৈধ সহবাসের কারণে যে পাপ ব্যাধিটি অর্জন করা হইয়াছে, তাহার চিকিৎসাও গোপনে অ্যালোপ্যাথিক ইন্জেক্শনাদির দ্বারা সম্পন্ন হয়। যখনই অবৈধ উপায়ে বাহ্য স্রাবটি লুপ্ত হইয়া গেল, তখনই রোগশক্তি অন্তর্মুখীন হইয়া অন্যান্য যন্ত্রাদি আক্রমণ করিতে থাকিবে এবং এইরূপে সাইকোসিস দোষের ভিত্তি পত্তন অর্থাৎ সূচনা বা আরম্ভ করা হইল। এই সময়েও যদি প্রকৃত আরোগ্যজনক চিকিৎসা আরম্ভ করা হয়, তাহা হইলেও মঙ্গল; কিন্তু তাহাও হয় না।
সাইকোসিস মানব শরীর - যন্ত্রের শারীরিক এবং মানসিক বিকৃতির একটি অবস্থা।
গনোরিয়া একটি ইনফেকসিয়াস বা সংক্রামক (Infectious) রোগজ অবস্থা বোঝায় যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা পরজীবীর মতো ক্ষতিকর জীবাণুর মাধ্যমে এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়ায়।
অতএব, সাইকোসিস বলিলে গণোরিয়া বুঝায় না। "গণোরিয়া" রোগ চাপা পড়িয়া সাইকোসিস দোষের উৎপত্তি হয়।
সোরার সহিত মিলিত হইয়া সাইকোসিস আবার জটিলতম অবস্থার সৃষ্টি করে।
অতএব, সাইকোসিসের প্রথম নিদর্শন হল গনোরিয়া গনোকক্কাই (gonococci)-এর তরুণ সংক্রমণ এবং "গনোরিয়া" এর উপযুক্ত চিকিৎসা না হইলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেরও স্থায়ী সাইকোসিস দোষের সৃষ্টি হয়।
সাইকোসিসের দ্বিতীয় নিদর্শন ডুমুরাকৃতি আঁচিল। ঐ আঁচিলগুলি সাধারণতঃ নরম রক্তবর্ণ, সহজে রক্তস্রাবপ্রবণ, বেদনাযুক্ত ও তৎসহ দুর্গন্ধযুক্ত মিষ্টস্রাব থাকে। কখনও কখনও ঐ আঁচিলগুলি রক্তবর্ণ ও মসৃণ হইতে দেখা যায়।
যতদিন পর্যন্ত এই আঁচিলগুলিতে অন্যায় ঔষধাদি দ্বারা বা বাহ্য উপায়ে বিলুপ্ত করা না হয়, ততদিন ধাতু বিকৃতির কোন লক্ষণ দেখা যায় না।
ঐসব আঁচিলের সহিত অর্জিত বা প্রাপ্ত সাইকোটিক রোগীর লালবর্ণের তিল সাধারণতঃ বক্ষে অথবা শরীরের উপরের অংশে দৃষ্ট হয়। অবশ্য শরীরের যে কোন অংশে লালবর্ণের তিল থাকিতে পারে, কিন্তু সাধারণত উহা বক্ষে দৃষ্ট হয়। ইহাদের আকার আলপিনের মাথা হইতে মটর দানা পর্যন্ত হইতে পারে।
আঁচিল ও তিল সাইকোসিসের তৃতীয় অবস্থার নিদর্শন।
গণোরিয়া স্রাব বা আঁচিলকে বিলুপ্ত করা হইলে কিছুকাল পরে ধাতু বিকৃতির নিশ্চিত লক্ষণরূপে বাত [আর্থ্রাইটিস (Arthritis)] দেখা দেয়।
নোট: বাত [আর্থ্রাইটিস (Arthritis)] হলো অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের প্রদাহজনিত একটি সমস্যা, যা জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব ও আড়ষ্টতা সৃষ্টি করে দেখা যায়।
বাতের লক্ষণগুলি অবিকল হোমিওপ্যাথিক ঔষধ রাসটক্সের ন্যায় দেখা যায়, কিন্তু রাসটক্সে আন্টি-সাইকোটিক ঔষধ না হওয়ায় এই ঔষধ দ্বারা কেবল সাময়িক উপশমই দেখা যায়।
অন্ডকোষ প্রদাহ, আক্ষেপিক হাঁপানি, স্ত্রীলোকদিগের জরায়ু ঘটিত বহু প্রকার ব্যাধি, অর্শ, আঁচিল, নানাপ্রকার মাংসবৃদ্ধি, নানা স্থানের স্রাব, মূত্রযন্ত্রের যাবতীয় পীড়া, স্নায়বিক যন্ত্রণা, কোন স্থানের মাংসপেশী সঙ্কুচিত হওয়া, ঋতুকালীন নানাপ্রকার কষ্ট, এক বৎসা, মৃত বৎসা, বন্ধ্যা, জরায়ুর টিউমার, ক্যানসার ইত্যাদি সবই সাইকোসিস দোষের নিদর্শন।
বর্ষাকালে এবং ভিজা স্যাঁতসেতে আবহাওয়ায় সাইকোসিস দোষ এর ব্যাধি গুলোর বৃদ্ধি দেখা যায়। সাধারণতঃ দিবাভাগেই সাইকোটিক রোগীর যন্ত্রণার বৃদ্ধি দেখা যায়।
পুনঃ পুনঃ বসন্তের টিকা এবং অন্যান্য সকল প্রকার টিকা গ্রহণের ফলেও সাইকোটিক অবস্থা বা দোষের সৃষ্টি হয়।
আক্রান্ত ব্যক্তির গণোরিয়া বিষ বা সাইকোটিক বিষের যে অবস্থা থাকে, সহবাসের দ্বারা অপর ব্যক্তির মধ্যেও ঠিক সেই অবস্থার লক্ষণই দৃষ্ট হয়। গণোরিয়ার প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির সহবাসের দ্বারা অপর ব্যক্তিও সেই অবস্থায় আক্রান্ত হয়।
সাধারণতঃ প্রাথমিক অবস্থার লক্ষণসমূহ অন্তর্হিত হইবার তিন মাস পরে এবং সময় সময় এক বা দুই বৎসর পর্যন্ত সময় পরে গণোরিয়ার দ্বিতীয় অবস্থা আসিতে দেখা যায়। এই দ্বিতীয় অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তির সাহচর্যে কোন ব্যক্তি আসিলে তাহারও আক্রান্ত ব্যক্তির ন্যায় দ্বিতীয় অবস্থার লক্ষণসমূহ দৃষ্ট হইবে।
দ্বিতীয় অবস্থাতেও যদি রোগীকে সমবিধানের মতে আরোগ্য করা না যায়, তাহা হইলে এক হইতে তিন বৎসর মধ্যে গণোরিয়ার তৃতীয় অবস্থা বা টার্সিয়ারী বা প্রকৃত সাইকোসিস অবস্থা আসে।
আবার, সময় সময় প্রাথমিক অবস্থা চাপা পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থা আসিয়া যায়। আবার ঐ অবস্থা আসিতে বহু বৎসর সময়ও লাগিতে পারে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থা আসিতে কম বা বেশী সময় আসা নির্ভর করে রোগীর আভ্যন্তরীণ অবস্থা বা ধাতু প্রকৃতির উপর।
যদি প্রাথমিক অবস্থায় (primary stage) হোমিওপ্যাথিক মতে চিকিৎসা করা হয়, তাহা হইলে কখনও গণোরিয়ার দ্বিতীয় (secondary stage) ও তৃতীয় (tertiary stage) অবস্থা আসে না। চিকিৎসাকালীন দ্বিতীয় অবস্থায় কিছু কিছু মৃদু ধরণের লক্ষণ আসিলেও আসিতে পারে।
নোট : সিফিলিস রোগ সম্বন্ধেও ঐ কথা সত্য। সুতরাং বলা যায় যে, গণোরিয়া বা সিফিলিসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থার আগমন বা আবির্ভাব অনুপযুক্ত চিকিৎসার ফল।
সাইকোসিস দোষ যেমন নিজের দ্বারা অর্জিত হয়, তেমনি মাতাপিতা হইতেও প্রাপ্ত হয়।
সাইকোসিস চিকিৎসা প্রণালী :-
রোগীর-পূর্ব ইতিহাস ও বর্তমান কষ্টকর লক্ষণাবলী হইতে সাইকোসিসের অবস্থিতি লক্ষণ সমূহ স্থির করিতে হইবে এবং বর্তমান কষ্টকর লক্ষণগুলি সাইকোসিস দোষজনিত হইলে অ্যান্টি-সাইকোটিক ঔষধ দ্বারা উহার চিকিৎসা করিতে হইবে।
সাইকোসিস দোষঘ্ন ঔষধ দ্বারা কিছুকাল চিকিৎসা করিবার পর সোরা বা সিফিলিস দোষজনিত লক্ষণ যদি বিকশিত হয়, তাহা হইলে বিকশিত দোষঘ্ন ঔষধটি প্রয়োগ করিতে হইবে এবং যে দোষটি যখনই প্রবল হইয়া রোগীকে কষ্ট প্রদান করে, তখনই সেই দোষঘ্ন ঔষধ প্রয়োগ করিয়া তাহার প্রতিবিধান অর্থাৎ নিরাময় করিতে হইবে।
নোট : ইউনিভার্সেল সত্য বা চিরন্তন সত্য কথা মনে রাখা দরকার যে, এক সময়ে একটি মাত্র দোষই কার্যকরী হইয়া রোগীকে কষ্ট দেয়, বাকী দোষগুলি তখবন সুপ্তাবস্থায় রোগী শরীরে অবস্থান করে।
বিকশিত দোষটি সেই দোষঘ্ন ঔষধের দ্বারা দুর্বল হইয়া সুপ্ত বা বিলুপ্ত হইলে তখন অন্য একটি দোষ আবির্ভূত হইয়া রোগীকে কষ্ট দেয়। এইভাবে যখন যে দোষটি বিকশিত হইয়া রোগীকে কষ্ট দিতে থাকে, তখন সেই দোষঘ্ন ঔষধ দ্বারাই রোগীর চিকিৎসা করিতে হইবে।
জটিল সাইকোটিক রোগীর প্রাথমিক নিদর্শন বাত বা কোন স্রাব আনয়ন করিতে অনেক সময় দুই বা তিন বৎসর সময়ের প্রয়োজন হয়।
জটিল সাইকোটিক রোগীতে স্রাবের প্রকৃতি মার্কুরিয়াস ও সালফারে দৃষ্ট হইলেও উহা প্রয়োগে রোগীর ক্ষতি হয়।
সাধারণ গ্লীট অবস্থা ( গ্লীট অবস্থা বলতে মূলত পুরানো বা ক্রনিক গনোরিয়া (Chronic Gonorrhea) রোগকে বোঝায়। এটি মূত্রনালীর একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা ইনফেকশন, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করার কারণে তৈরি হয়।) অনেক মাস স্থায়ী হইলেও সর্বদাই সাইকোসিসের নিদর্শন নহে। প্রায়ই দোষটি সোরাজনিত। সুতরাং সোরা দোষঘ্ন ঔষধ লক্ষণ সাদৃশ্যে প্রয়োগ করিতে হয়।
গণোরিয়ার স্রাবটি বিলুপ্ত হইয়া অন্ডকোষ প্রদাহ হইলেই সাইকোসিস দোঘয় একটি ঔষধ নির্বাচন করিতে হইবে তাহা নহে। একটি উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচন করিলেই হইবে।
বিবাহের পূর্বে স্ত্রীলোকটির স্বাস্থ্য নীরোগ ছিল, অথচ বিবাহের পর হইতেই যদি অবগত হওয়া যায় যে, তাহার স্বাস্থ্য হঠাৎ খারাপ হইয়া পড়িয়াছে এবং জরায়ু ঘটিত ব্যাধিতেই সে কষ্ট পাইতেছে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই জানিতে হইবে যে, স্ত্রীলোকটি সাইকোটিক দোষ প্রাপ্তির ফলেই ব্যাধিগ্রস্তা হইয়া পড়িয়াছে। সাধারণতঃ সাইকোসিসের তৃতীয় অবস্থার লক্ষণসমূহ স্ত্রীলোকটির স্ত্রীঅঙ্গে বিস্তৃত শ্লৈষ্মিক ঝিল্লীর মধ্যে সংক্রামিত হইয়া থাকে। প্রায়ই ডিম্বকোষ, ফেলোপিয়ান টিউব ইত্যাদি আক্রান্ত হইতে দৃষ্ট হয়। অথবা স্ত্রীলোকটি রক্তহীনতায় ভুগিতে থাকে। এই রক্তহীনতা দীর্ঘদিন চলিতে থাকিলে জরায়ুতে বা স্তনে ক্যানসার, বহুমূত্র ইত্যাদি বহুবিধ ব্যাধির সৃষ্টি হয়। কোন রোগী সাইকোটিক দোষে ভুগিতে থাকিলে যে কোন তরুণ ব্যাধির আক্রমণ হউক না কেন, আরোগ্য হইতে বিলম্ব হয়। সোরা দোষ থাকিবার জন্য ব্যাধি আরোগ্য হইতে বিলম্ব হইলে যেমন লক্ষণানুযায়ী কোন সোরা দোষঘ্ন ঔষধ প্রয়োগ করিতে হয়, তেমনি সাইকোসিস দোষ থাকিবার জন্য আরোগ্য হইতে বিলম্ব হইলে লক্ষণ সাদৃশ্যে কোন সাইকোসিস দোষঘ্ন ঔষধ দিতে হয়। যদি টিউবারকুলার দোষের কোন ইতিহাস না পাওয়া যায়, তাহা হইলে উক্ত সিদ্ধান্তই সত্য বলিয়া মনে করিতে হইবে। প্রায় ক্ষেত্রেই, স্বামী হইতে স্ত্রীতে ব্যাধি সংক্রামিত হয়।
ইহাও দেখা যায় যে, স্ত্রীলোকটি বিবাহের পূর্বে কোন কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় নাই এবং বিবাহের পর ২/ ৩ বৎসর পর্যন্ত সুস্থই ছিল।
কিন্তু সন্তান প্রসবের পরই তাহার স্বাস্থ্যভঙ্গ হইতে আরম্ভ হইল-তাহার জরায়ুঘটিত নানা ব্যাধি, বাত, পৃষ্ঠবেদনা, মূত্রস্থলীর নানা উপসর্গ, শিরঃপীড়া, মাসিক ঋতুস্রাবের অনিয়মতা ইত্যাদি বহুপ্রকার উপসর্গ দৃষ্ট হয়। মোট কথা, সন্তান হওয়ার পর হইতে স্ত্রীলোকটি আর সুস্থ হয় নাই। স্বামীর ইতিহাস হইতেই ইহার কারণ পাওয়া যাইবে। যদিও স্বামীর সাইকোসিসের প্রাথমিক ও দ্বিতীয় অবস্থা বহুকাল অতিক্রান্ত হইয়াছে এবং তৃতীয় অবস্থায় পড়িয়াছে। প্রাথমিক বা দ্বিতীয় অবস্থায় নিদর্শনগুলি না থাকিবার জন্য অনেক সময় স্বামীর নিকট হইতে সহসা বা এক কথায় সাইকোসিসের ইতিহাস পাওয়া যায় না এবং ইতিহাস পাইলেও অনেক চিকিৎসক মনে করেন যে, বিবাহের পূর্বেই যখন স্বামীর গণোরিয়া নির্দেশক লক্ষণসমূহ অন্তর্হিত হইয়াছে, তখন স্ত্রী স্বামীর সংস্পর্শে আক্রান্ত হয় নাই।
স্বামীকে গোপনে জিজ্ঞাসা না করিলে স্ত্রীর নিকট অনেক স্বামী তাহার প্রথম যৌবনের কাহিনী বলিতে চাহে না। এই সব ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকটিকে সাইকোসিস দোষঘ্ন কোন ঔষধ লক্ষণসাদৃশ্যে নির্বাচন করিয়া দীর্ঘদিন চিকিৎসা করিলে তবে ইহার প্রতিকার হইতে পারে। কেবলমাত্র দোষঘ্ন ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা করিলে দোষঘ্ন ঔষধটি যথেষ্ট উচ্চশক্তিতে প্রদান করিতে হইবে এবং এক একটি শক্তির ক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট সময়ও অপেক্ষা করিতে হইবে।
রোগীলিপি : কয়েক বৎসর পূর্বে জনৈক পোষ্টাল কেরাণী গণোরিয়ার দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার দ্বারা দৃশ্যতঃ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়। ৪।৫ বৎসর পর্যন্ত কোন লক্ষণই আর পাওয়া যায় না। পূর্বেই প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যু হইয়াছিল। দ্বিতীয়বার বিবাহের জন্য চিকিৎসকেরা বহু পূর্বে অনুমতি দিয়াছিলেন এবং নানা প্রকার পরীক্ষাতেও রোগীর কোনপ্রকার রোগের লক্ষণ পাওয়া যায় না। বিবাহের পর স্ত্রী যখন ছয় মাসের গর্ভবতী তখনই স্বামীর মূত্রনালীতে সামান্য স্রাবের সহিত প্রসাবে ঈষৎ জ্বালা দেখা যায় এবং স্বামী আমার নিকট স্ত্রীসহ চিকিৎসার্থ আসেন। স্ত্রীর বয়স ২০/২২ বৎসর এবং বাল্যকাল হইতে তাহার কোন ব্যাধিই হয় নাই। এ ক্ষেত্রে যুবকটির যদি মূত্রনালী হইতে ঐ সামান্য স্রাবটুকু নিঃসৃত না হইত, তাহা হইলে নিজেকে সে সম্পূর্ণ সুস্থ বলিয়া মনে করিত এবং চিকিৎসকের নিকট আসিবার তাহার কোন প্রয়োজন হইত না। দীর্ঘ বৎসর পরে স্ত্রীর অসুখের জন্য নিজের ইতিহাসের উল্লেখ করিবার কোন প্রয়োজনও সে মনে করিত না।
নোট : স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী বা সন্তানাদির চিকিৎসার জন্য অনেক সময় আমরা পূর্ব ইতিহাস সংগ্রহ করিতে পারি না। কিন্তু দোষত্রয়ের নিদর্শন সমূহ সংগ্রহ করিয়া আমরা সাফল্যের সহিত রোগীর চিকিৎসা করিতে পারি।
সাইকোসিস দোষ চাপা পড়িবার পর প্রত্যেক ক্ষেত্রেই যে রক্তহীনতার লক্ষণ প্রকাশ পাইবে, তাহা নহে।
কোন কোন ক্ষেত্রে চাপা পড়িবার অধিক বা অল্পকাল পরে স্নায়বিক বেদনা, বাত, ডিম্বকোষে বেদনা, হজমের ব্যতিক্রম, মানসিক অবস্থার তারতম্য ইত্যাদি লক্ষণ দৃষ্ট হয়। কোন্ লক্ষণ যে কোন্ রোগীর ভিতর দেখা দিবে বা কোন্ রোগীর কোন্ যন্ত্রে বিশৃঙ্খল দেখা দিবে, তাহা বলা যায় না। আবার চাপা পড়িবার পর রক্ত কণিকার উপর আক্রমণ আসিলেও সঙ্গে সঙ্গে উহা উপলব্ধি করা যায় না। অবশ্য রক্তকণিকার আক্রান্ত হওয়ার অবস্থা প্রাথমিক অবস্থায় ধরা না পড়িলেও শ্লেষ্মা বা সর্দি সম্বন্ধীয় ব্যাধি উহার অব্যবহিত পরেই আসিয়া থাকে।
সাইকোসিস দোষ চাপা পড়িবার পর - সন্ধিবাতের অবস্থা দেখা গেলেও এবং বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুসন্ধান করিলে উহার কারণস্বরূপ স্ত্রী বা পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই সাইকোসিসের সংক্রমণ বা দোষের ইতিহাস প্রাপ্ত হওয়া গেলেও সাইকোসিস দোষমুক্ত অবস্থাও দৃষ্ট হয়। ইদানীং সাইকোসিসের প্রাবল্য থাকিলেও বহু পূর্বে এবং এখনও অনেক সংসারে কেবলমাত্র সোরা বা সিউডো সোরা জনিত প্রবল বাত জ্বরের [ রিমিউটিক ফিভার (Rheumatic Fever) ] আক্রমণ দৃষ্ট হয়। এই প্রকার বাতজ্বরের উত্তাপ ১০৪/১০৫ ডিগ্রী পর্যন্ত হইতে দেখা যায়।
আমার নিকট, বিগত কয়েক বৎসরের মধ্যে যে কয়েকটি রোগী হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জন্য আসিয়াছে , তাহাদের সবগুলিই অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার গ্রহণ করার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। তাহাদের সবগুলিই অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার পর - বাতজ্বর যখন হৃৎপিন্ড আক্রমণ করিয়াছিল এবং তজ্জন্য রোগীদের প্রবল শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়া রোগীকে শয্যাশায়ী করিয়া ফেলিয়া ছিল, তখনই আসিয়াছিল।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার পর এই সব রোগীরা পুনরায় কর্মক্ষম হইয়াছিল। এইরূপ আক্রমণ সাধারণতঃ যুবক ও যুবতীদের ক্ষেত্রেই হইতে দেখা যায়। বাতের আক্রমণে প্রদাহিত সন্ধিগুলি স্ফীত স্পর্শসহিষ্ণু হয় এবং টাইফয়েড জ্বরের ন্যায় জ্বর হইতে দেখা যায়। কিন্তু সাইকোসিসের ইতিহাসযুক্ত সন্ধিবাতে জ্বর ( রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, রিউমেটিক ফিভার বা বাতজ্বর, অথবা সেপ্টিক আর্থ্রাইটিস) সাধারণতঃ উচ্চ হয় না এবং বেদনাও তাদৃশ যন্ত্রণাজনক হয় না।
প্রায় ৪০।৪৫ বৎসর পূর্বে আমার প্রথম চিকিৎসা জীবনে আমি একজন দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ দেহ যুবকের গণোরিয়া জনিত সর্বত্র সন্ধি স্থানের বা গাইটের অত্যধিক স্ফীতি ও মরণাধিক যন্ত্রণাপ্রদ রোগী দেখিয়াছিলাম।
রোগীর সামান্য জ্বর ছিল, কিন্তু প্রস্রাবের সময় এত যন্ত্রণা হইত যে, রোগী চিৎকার করিত এবং পাড়ার লোক আসিয়া জড় হইত। রোগী শয্যাত্যাগ করিতে পারিত না। রোগী অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারের কম্পাউন্ডার বিধায় প্রথমে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা হয়। কিন্তু কোনও ফল হয় নাই। তখন পেনিসিলিন ইত্যাদি ঔষধের প্রচলন হয় নাই।
পিতা কবিরাজ হওয়ায় কবিরাজী চিকিৎসাও হয়, কিন্তু উহাতেও কোন সুবিধা হয় নাই। কবিরাজীরা ঐ অবস্থাকে "শিবামুন্ড”, সুতরাং অনারোগ্য বলিয়া উহা বর্ণনা করিয়াছিলেন। আমি তখন নূতন চিকিৎসক। চিকিৎসার সময় লাগিবে বলায় তাহারা আমার চিকিৎসাধীনে থাকিতে স্বীকৃত হয় নাই। কয়েক দিন পরে সংবাদ পাইলাম যে, রোগী এতাদৃশ দুর্বল ও অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে যে তাহার মৃত্যু আসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। অথচ সে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করিতে স্বীকৃত নহে।
আমি দ্রুত আরোগ্যের আশ্বাস দিয়া তাহার জীবন রক্ষার জন্য নাইট্রেট অফ সিলভারের ( আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম (Argentum Nitricum), সংক্ষেপে যাকে আর্জেন্ট নাইট (Argent. nit.) বলা হয়।) কয়েক গ্রেণ যজ্ঞ-ডুমুর ভিজান জলসহ দৈনিক এক মাত্রা করিয়া সেবন করিতে দিলাম।
অতীব আশ্চর্যের কথা ! ঔষধের ক্রিয়া যেন ম্যাজিকের মত হইল। মাত্র তিন দিনে তিনমাত্রা ঔষধ প্রয়োগে সে প্রায় সুস্থ হইল এবং পাঁচ দিনে পাঁচ মাত্রা ঔষধ প্রয়োগের পর সে সিকি মাইল হাঁটিতে পারিল।
প্রস্রাবের যন্ত্রণা, বাতের যন্ত্রণা, জ্বর ইত্যাদি কোন উপসর্গই তাহার আর রহিল না। রোগী এখনও জীবিত আছে, তবে তাহার আভ্যন্তরীণ অবস্থার বিষয় আমি অবগত নহি। রোগী দৈনন্দিন কার্য করিবার উপযুক্ত হইবার পর তাহাকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কথা বলিয়াছিলাম, কিন্তু পুনরায় স্রাব বাহির হইবার ভয়ে সে চিকিৎসায় স্বীকৃত হয় নাই।
নোট : সাইকোসিসের ইতিহাসযুক্ত সন্ধিবাত চাপা পড়া, মূত্রনলী হইতে স্রাব বা চাপা পড়া প্রদরস্রাব পুনরায় নিঃসৃত না হওয়া পর্যন্ত উপশম বা আরোগ্য করা যায় না।
নির্দোষ বংশ ইতিহাস এবং উত্তম স্বাস্থ্যের অধিকারী এমন ২/৩ ব্যক্তি আমার চিকিৎসাধীনে আসিয়াছিলেন, যাহারা প্রথম যৌবনে গণোরিয়ায় আক্রান্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু অসদৃশ চিকিৎসা সত্ত্বেও ১০।১৫ বৎসরের পরেও তাহাদের কুফলগুলি অল্প ও মৃদু ধরনের হইয়াছিল। সুতরাং কুফলগুলি মৃদু হইবে বা প্রচন্ড প্রকৃতির হইবে, স্বল্প বা অধিক সময়ে প্রকাশ পাইবে, তাহা আক্রান্ত ব্যক্তির স্বীয় আভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর নির্ভর করে।
গ্লীট (gleet) গণোরিয়ার দ্বিতীয় অবস্থা অথবা প্রাথমিক অবস্থার অর্ধ-পুরাতন অবস্থা। এই অবস্থায় ভুগিতেছে, এমন ব্যক্তির দ্বারা যদি অন্য কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়, তাহা হইলে সে ব্যক্তির মধ্যে গণোরিয়ার প্রাথমিক অবস্থা বা দ্বিতীয় অবস্থার অথবা উভয় অবস্থার লক্ষণ দেখা দিবে। গ্লীট অবস্থার সংস্পর্শে বহু রোগী আক্রান্ত হয়।
নোট : কিন্তু বিশেষ যত্ন সহকারে রোগীর বিবরণ সংগ্রহ না করিলে ব্যাধি আক্রমণের মূল কারণটি অবগত হওয়া যায় না।
কারণ অসদৃশ বিধানে চিকিৎসা হইবার পর গ্লীট অবস্থায় উপনীত হইলে তাহাকে বলা হয় যে, মূল ব্যাধি হইতে মুক্ত হইয়াছে এবং স্ত্রী বা অন্য কোন রমণী আর তাহার দ্বারা সংক্রামিত হইবে না। স্বামীর গ্লীট অবস্থায় - স্ত্রীর সহিত উপগত (সহবাস) হইলেও ১০।১৫ বৎসরের মধ্যে তাহার দৃশ্যতঃ কোন উপসর্গ দেখা না দিতেও পারে। কিন্তু তারপর যখন ঘনঘন সর্দি, হাঁচি ইতাদির সহিত ব্রঙ্কাইটিস, কষ্টকর কাসি প্রভৃতি উপসর্গে দীর্ঘদিন ভুগিতে থাকে এবং তাহার সহিত ঘনঘন প্রস্রাবের সহিত জ্বালা দেখিতে পাওয়া যায়, তখন রোগীর ব্যাধির মূলে যে সাইকোসিসের ইতিহাস আছে, তাহা সতর্ক চিকিৎসকের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। এইসব রোগিণীর ক্ষেত্রে যে পর্যন্ত গভীর ক্রিয়াশীল অ্যান্টি-সাইকোটিক ঔষধ না দেওয়া যায়, সেই পর্যন্ত ব্যাধির সাময়িক উপশম ভিন্ন কখনও আরোগ্য হয় না।
দীর্ঘ বৎসরের চিকিৎসা জীবনে আপনার অনেক রোগীর কথাই মনে পড়িবে, যাহাদিগের ক্ষেত্রে ব্যাধির মূল কারণ অবগত না হওয়ার জন্য কিম্বা সম লক্ষণে সাইকোসিস দোষঘ্ন ঔষধ প্রদান না করিবার ফলে যথেষ্ট যত্ন সহকারে রোগিণীর দৃশ্যতঃ লক্ষণ সাদৃশ্যে ঔষধ প্রয়োগ করিয়াও রোগিণীকে উপশম দেওয়া ভিন্ন আরোগ্য করিতে পারেন নাই।
ইতঃপূর্বেই বলা হইয়াছে, যে, সাইকোসিসের তৃতীয় অবস্থা প্রাথমিক অবস্থা চাপা পড়িবার এক হইতে দুই বৎসরের মধ্যে আসিতে পারে; আবার অনেক সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা বা জীবনীশক্তি সবল থাকিলে ঐ অবস্থা আসিতে বহু বৎসর সময় লাগিতে পারে। কিন্তু মধ্যবর্তী কালটা রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে না।
এই মধ্যবর্তী সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্নায়বিক বেদনা, শিরঃপীড়া, বাতজ বেদনা, মানসিক উপসর্গ, মাসিক ঋতুস্রাবের অনিয়মিততা, সর্দিস্রাবের বৃদ্ধি ইত্যাদি নানাপ্রকার উপসর্গে রোগীকে ভুগিতে দেখা যায়; কিন্তু কোন যন্ত্রগত পরিবর্তন দৃষ্ট হয় না।
গ্লীট অবস্থায় আসিলে অনেক সময় চিকিৎসক ও রোগী কেহই ইহার সম্যক গুরুত্ব প্রদান করেন না। কিন্তু রোগী এই অবস্থায় শরীরে ও মনে কখনও সুস্থবোধ করে না। এই অবস্থায় উপনীত হইলে এবং অনেকদিন ধরিয়া এই অবস্থা চলিতে থাকিলে সাধারণতঃ মনে করা হয় যে, রোগী প্রায় আরোগ্য হইয়াছে বা ইহার সংক্রমণ শক্তি নাই ইত্যাদি।
নোট: কিন্তু গ্লীট (Gleet), গণোরিয়ার প্রথম অবস্থার ন্যায় শক্তিশালী এবং এই অবস্থায় সংক্রমণ হইলে আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থার লক্ষণসমূহ প্রকাশ করিতে পাইতে দেখা যায়।
তৃতীয় অবস্থায় - উদ্ভেদ, গেটে বাত, কোন স্থানের বিবৃদ্ধি দেখা যায়। গ্লীট অবস্থায় কোন উগ্র লোশন দ্বারা বা অ-হোমিওপ্যাথিক উপায়ে চাপা দিলে তৃতীয় বা টার্সিয়ারী অবস্থা দ্রুত আসিয়া থাকে।
দ্বিতীয় বা প্রাদাহিক অবস্থায়- কিউরেট করা, কিম্বা জরায়ু ডিম্বকোষ ইত্যাদি বস্তি কোটরের কোন যন্ত্রকে অপসারিত করিলে অথবা লিউকোরিয়ার স্রাব বন্ধ করিলে কিম্বা তরুণ বাত রোগ চাপা দিলে দ্রুত তৃতীয় অবস্থায় (টার্সিয়ারী অবস্থা) আসিয়া থাকে।
রোগের প্রাথমিক ও দ্বিতীয় অবস্থায় চাপা পড়িয়া বহুকাল থাকিলেও উহা সুপ্তভাবে রোগীর অভ্যন্তরে থাকে এবং উপযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ঔষধের উচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হইলে লুপ্তস্রাব পুনরায় প্রকাশিত হয় এবং রোগীকে নির্মল আরোগ্য করা সম্ভব হইয়া থাকে।
কিন্তু তৃতীয় অবস্থায় উপনীত হইয়া যখন আঁচিল বা অন্য কোন চর্মোদ্ভেদ বাহির হয়, তখন আর লুপ্ত স্রাব বাহির করা যায় না।
লুপ্ত স্রাব বাহির করা সম্ভব নহে বলিয়া সাইকোসিসের তৃতীয় অবস্থায় রোগীকে আরোগ্য করা দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য হইয়া পড়ে।
কারণ এই অবস্থায় সোরা দোষ জীবনীশক্তিকে আক্রমণ করিয়া ব্যাধিকে জটিল করিয়া ফেলে।
নোট : সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস শরীরাভ্যন্তরে পূর্ণতা প্রাপ্ত হইলে উহা চর্মে প্রতিফলিত হয় এবং আভ্যন্তরীণ উপসর্গের উপশম ঘটে। এই স্থানীয় লক্ষণগুলি আভ্যন্তরীণ অবস্থারই প্রতিনিধিস্বরূপ।
দুঃখের বিষয়, এই স্থানীয় লক্ষণগুলিকে আবার অপ -হোমিওপ্যাথিক প্রথায় বিলুপ্ত করিয়া রোগীর অবস্থা আরও জটিল ও দুরারোগ্য করিয়া ফেলা হয়।
গণোরিয়ার প্রাথমিক অবস্থা অতিক্রান্ত হইবার পর রোগ যখন দ্বিতীয় অবস্থায় আসিয়া গিয়াছে, তখন যেন রোগীকে সাময়িক উপশমদায়ক ঔষধ প্রদান করা না হয়। দ্বিতীয় অবস্থায় সর্বদাই সাইকোসিস দোষঘ্ন গভীর ক্রিয়াশীল ঔষধের উচ্চ শক্তি দ্বারা চিকিৎসা করিতে হইবে। তাহা হইলে রোগীকে সহজেই এবং সম্ভবত অল্প সময়ে আয়ত্বে আনা যায়।
সাইকোসিস এমন একটি গভীর ক্রিয়াশীল দোষ, যাহা শরীরাভ্যন্তরের প্রত্যেকটি কোষকে আক্রমণ করিতে পারে। সুতরাং প্রাথমিক অবস্থা অতিক্রান্ত হইবার পরই স্থায়ীভাবে যাহাতে দোষটি আরোগ্য হইয়া যায়, তাহার জন্য যত্নবান হইতে হইবে।
সাইকোটিক বিষ শরীরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিবার একটি সহজ উপায় হইতেছে ভ্যাকসিনেশন বা টিকাদান ।
পাইকারী হারে সমগ্র জাতিকে প্রতি বৎসর টিকা দেওয়ার ফলে নানাপ্রকার চর্মরোগ বিশেষতঃ একজিমা, গ্যাংগ্রিণ, আর্টিকেরিয়া, সোরাইয়েসিস, বিসর্প ইত্যাদি কতপ্রকার চর্মরোগ যে হইতেছে, তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। আমি নানা প্রকার চর্মরোগ কেবলমাত্র অ্যান্টি-সাইকোটিক ঔষধ থুজার দ্বারা আশ্চর্যভাবে আরোগ্য করিতে সমর্থ হইয়াছি।
টিউবারকুলার প্রবণতাযুক্ত শিশুদের পক্ষে পুনঃ পুনঃ টিকা দেওয়া অত্যন্ত ক্ষতিকারক।
আমরা কোন সংক্রামক রোগ বিশেষতঃ আদত বসন্তের প্রতিষেধকের বিরোধী নহি। কিন্তু যেভাবে স্কুলমাত্রায় জান্তব গো-বীজ শরীরাভ্যন্তরে প্রবেশ করান হইতেছে, তাহা অত্যন্ত ক্ষতিকর বলিয়া আমরা মনে করি।
নোট : "হোমিওপ্যাথিক মতে বসন্তের প্রতিষেধক ঔষধ" নামক পুস্তকে আমরা এই সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করিয়াছি। কোন স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে কাহারও ইচ্ছা বা বিবেকের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র আইনের ভীতি প্রদর্শন করাইয়া কাহারও শরীরের অভ্যন্তরে কোন মারাত্মক জান্তব বিষ প্রবেশ করান সমীচীন কিনা তাহা জনসাধারণের বিচার্য বিষয়।
সাধারণ সহজ প্রকৃতির গণোরিয়ার রোগীতেও যদি ক্ষয়রোগপ্রবণ ধাতু (টিউবারকুলার দোষ) দেখা যায়, তাহা হইলে গণোরিয়া আরোগ্য করিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হইবে, ইহা প্রথম হইতেই স্মরণ রাখা ভাল।
রক্তহীনতা (রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায় এবং শরীরের টিস্যুতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়।) ব্যাধির সমস্ত অবস্থাতেই বিশেষতঃ ব্যাধির দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থায় অধিকতর দৃষ্ট হয়। মুখমন্ডলের অবস্থা সময় সময় ভস্মের ন্যায়, ধূসর বর্ণের ও স্ফীতির ন্যায় দেখায়। সর্বাঙ্গীন রক্তহীনতা অনেক সময় স্তনের ও জরায়ুর ক্যানসার, বহুমূত্র, ব্রাইট্স ডিজিজ, শিশু কলেরা, তরুণ যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া এবং আরও অসংখ্য ব্যাধির কারণস্বরূপ হইয়া পড়ে।
প্রাথমিক গণোরিয়া কু-চিকিৎসার ফলে চাপা দেওয়ার পর টার্সিয়ারী অবস্থা আসিতে এক হইতে দুই বৎসর সময় লাগিতে পারে। জীবনীশক্তি সবল থাকিলে ঐ অবস্থা আসিতে কয়েক বৎসরও লাগিতে পারে। বাহ্য ঔষধ বা ঔষধসংযুক্ত জল দ্বারা ধৌত করা ইত্যাদির দ্বারা গণোরিয়ার গ্লীট চাপা পড়িয়া টার্সিয়ারী অবস্থার সৃষ্টি হয়। গ্লীট গণোরিয়ার দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় অবস্থার উপসর্গ। এই অবস্থাতেও প্রথম অবস্থার ন্যায় সাংঘাতিক ভাবে ব্যাধি আক্রমণ করিবার ক্ষমতা থাকে।
টার্সিয়ারী চর্মোদ্ভেদ প্রকাশিত হইলে, আর চাপা দেওয়া গণোরিয়ার স্রাব পুনঃ প্রকাশিত করা যায় না; সুতরাং এই অবস্থায় সাইকোসিসের আরোগ্য অতিশয় কঠিন এবং বিলম্বিত হইয়া পড়ে।
সিফিলিসের টার্সিয়ারী অবস্থাতেও দোষটি সোরার সহিত এতই মিশ্রিত হইয়া পড়ে যে, উহাদিগকে বিচ্ছিন্ন করা অতিশয় কঠিন হইয়া পড়ে।
গণোরিয়া প্রাথমিক ও দ্বিতীয় অবস্থায় চাপা পড়িয়া ব্যাধিটি যদি সুপ্তাবস্থায় কিছুকাল অবস্থিতি করে, তাহা হইলে আমাদের পক্ষে স্রাবটি পুনঃ প্রকাশিত করিতে খুব বেশী কঠিন হয় না।
প্রায়ই মেডোরিণাম, নাক্স ভমিকা, ক্যাল্ক-কার্ব, সালফার, সোরিনাম ইত্যাদি ঔষধের দ্বারা ঐ কার্য 'সাধন করা যায়।
নোট : - সোরা, সাইকোসিস অথবা সিফিলিসের টার্সিয়ারী অবস্থার নিদর্শনগুলি বাহির হইলে উহাকে অতিশয় জটিল বলিয়া চিন্তা করিতে হইবে। কারণ ঐ অবস্থায় দোষগুলি একেবারে শরীরের মূল্যবান যন্ত্রগুলি আক্রমণ করিয়া বসে। মসৃণ ও চ্যাপ্টা আঁচিলগুলি টিউবারকুলার ও সিফিলিটিক ধাতুর প্রবণতাসহ কোন সাইকোটিক রোগীর মুখমন্ডলে ও গ্রীবাদেশে দৃষ্ট হইলে উহা চিকিৎসা করা অতিশয় কঠিন জানিতে হইবে।
যে কোন প্রকারের দাদ হউক না কেন, উহা এক বিশেষ প্রকৃতির সাইকোসিস ব্যাধি ভিন্ন আর কিছুই নহে। মলমাদি প্রয়োগে চাপা দিলে উহার দ্বারা স্বাস্থ্য ভীষণভাবে খারাপ হয়, এমন কি বাত, পাকস্থলীর ব্যাধি, হিস্টিরিয়া, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ইত্যাদি নানাপ্রকার দুরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হয়।
দাদ বা দাউদ কেবলমাত্র এক বিশেষ ধরণের সাইকোসিস ব্যাধিই নহে- উহার সহিত সুপ্ত টিউবারকুলারের সংযোগ থাকে। প্রায়ই দেখা যায় যে, টিউবারকুলার রোগীদের কোন না কোন প্রকার দাদ ইত্যাদি টিনিয়া জাতীয় কোন চর্মরোগ থাকে।
সাইকোসিস দোষের সর্বপ্রধান কয়েকটি নিদর্শনের বিষয়ে নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
১। সাইকোসিস রোগীর গোপন করিবার প্রবৃত্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসকের নিকটেও অতি ধীরে ধীরে চারিদিকে দৃষ্টি দিয়া তবে নিজ ব্যাধির কথা বর্ণনা করিতে থাকে। তাহার পীড়ার বিষয় বা সাংসারিক বিষয অপরে কেহ অবগত হউক, ইহা রোগী পছন্দ করে না।
২। রোগীর মনটি রোগের উপর পড়িয়া থাকে। রোগটি সহজ হইলেও রোগীর মন হইতে রোগের চিন্তা যাইতে চাহে না এবং ফলে সে দ্রুত আরোগ্যের জন্য ঘন ঘন চিকিৎসক পরিবর্তন করে।
৩। ঝড়-বৃষ্টির সময় অথবা ঝড়-বৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ নিদর্শনটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
৪। সাইকোটিক রোগীর রোগ যাতনাগুলি ঘুরিয়া বেড়াইলে উপশম হয়। সেইজন্য একস্থানে অবস্থান করা সাইকোটিক রোগীর পক্ষে অসম্ভব।
৫। সাইকোটিক রোগীর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা খুব বেশি পরিমাণে দেখা যায়। লোকের নাম, ঠিকানা, তারিখ এবং দ্রব্যের নাম তাহার স্মরণ হয় না।
এইস্থানে একটি কথা বলিয়া রাখি। হ্যানিম্যানের সময় সাইকোসিসের প্রাধান্য ছিল না, সেইজন্য তিনি সাইকোসিস সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে কিছু লিখেন নাই। কিন্তু যুগের পরিবর্তন হইয়াছে,- বর্তমানে সাইকোসিসের প্রাধান্য অত্যধিক বেশী, এমনকি সাইকোসিস দোষ নাই এমন রোগী পাওয়া কঠিন।
কাজী সাইফ উদদীন আহমেদ
হেনেমেনিয়ান হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক
Tags:
Sycosis
>Share by:
Make a comments as guest/by name or from your facebook:
Make a comment by facebook: