ক্যান্সার এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা।

ক্যান্সার: মানবসভ্যতার প্রাচীনতম শত্রু।

ক্যান্সার একটি প্রাগৈতিহাসিক রোগ, যার অস্তিত্ব প্রাচীন মিশরীয় যুগ থেকেই স্বীকৃত। ১৯৩০ সালে অনূদিত Edwin Smith Papyrus-এ মিশরের চিকিৎসক Imhotep (প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৬২৫)–এর চিকিৎসা-শিক্ষা লিপিবদ্ধ ছিল। সেখানে স্তনে একটি “ফোলা গাঁট”-এর বর্ণনা রয়েছে, যা স্পর্শে ঠান্ডা ও শক্ত ছিল।

সাধারণ সংক্রমণ বা ফোঁড়া সাধারণত প্রদাহযুক্ত, উষ্ণ ও স্পর্শে বেদনাদায়ক হয়। কিন্তু এখানে বর্ণিত গাঁটটি ছিল শক্ত, ঠান্ডা এবং ব্যথাহীন—অর্থাৎ আরও ভয়ংকর কিছু। চিকিৎসা সম্পর্কে লেখকের কোনো পরামর্শ ছিল না।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৪৪০ সালে গ্রিক ঐতিহাসিক Herodotus পারস্যের রানি আতসা সম্পর্কে লিখেছেন, যিনি সম্ভবত প্রদাহজনিত স্তন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। পেরুর এক হাজার বছরের পুরোনো সমাধিক্ষেত্রে পাওয়া মমির অস্থিতে টিউমারের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা শুষ্ক মরুভূমির আবহাওয়ায় সংরক্ষিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক Louis Leakey আবিষ্কৃত দুই মিলিয়ন বছরের পুরোনো মানব চোয়ালের হাড়েও লিম্ফোমার প্রমাণ মিলেছে। অর্থাৎ মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই ক্যান্সারের উপস্থিতি রয়েছে।




ক্যান্সারের দীর্ঘ ইতিহাস:
গুটি বসন্ত ও ব্ল্যাক ডেথের মতো বহু মহামারি ইতিহাসে এসেছে ও প্রায় বিলীন হয়েছে। কিন্তু ক্যান্সার? এটি ছিল শুরুতে, ছিল মধ্যযুগে, এখনও আছে—বরং আগের চেয়ে ভয়াবহ রূপে।
প্রাচীনকালে ক্যান্সার সম্ভবত বিরল ছিল, কারণ এটি মূলত বার্ধক্যজনিত রোগ, আর তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল কম। দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও যুদ্ধে মানুষ অল্প বয়সেই মারা যেত—ফলে ক্যান্সার বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠেনি।

‘কর্কিনোস’ থেকে ‘ক্যান্সার’
গ্রিক চিকিৎসক Hippocrates (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০–৩৭০), যিনি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক নামে পরিচিত, ক্যান্সারের নাম দেন karkinos, যার অর্থ “কাঁকড়া”। মাইক্রোস্কোপে ক্যান্সার কোষের চারদিকে কাঁকড়ার পায়ের মতো ছড়িয়ে পড়া স্পিকিউল দেখা যায়—এটি এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যথার্থ উপমা।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে গ্রিক চিকিৎসক Galen ক্যান্সারের জন্য oncos (অর্থ: স্ফীতি) শব্দটি ব্যবহার করেন। এখান থেকেই এসেছে oncology (ক্যান্সারবিজ্ঞান), oncologist (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) ইত্যাদি শব্দ। তিনি -oma প্রত্যয়ও ব্যবহার করেন, যেমন—হেপাটোমা (যকৃতের ক্যান্সার), সারকোমা (নরম টিস্যুর ক্যান্সার), মেলানোমা (ত্বকের রঞ্জক কোষের ক্যান্সার)।
রোমান লেখক Aulus Cornelius Celsus, যিনি De Medicina গ্রন্থ রচনা করেন, karkinos শব্দটিকে ল্যাটিনে cancer হিসেবে অনুবাদ করেন। “টিউমার” শব্দটি যেকোনো অস্বাভাবিক কোষবৃদ্ধিকে বোঝায়—তা সৌম্য (benign) বা মারাত্মক (malignant) হতে পারে।

ক্যান্সারের প্রকৃতি
স্বাভাবিক টিস্যুর নির্দিষ্ট বৃদ্ধি-ধারা আছে। যেমন, একটি স্বাভাবিক কিডনি জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাড়ে, তারপর স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু ক্যান্সার কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তেই থাকে—যতক্ষণ না কোষটি মরে বা রোগী মারা যায়।

ক্যান্সারের দুই প্রকার:
সৌম্য (Benign) – বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ছড়ায় না (যেমন লিপোমা)।
মারাত্মক (Malignant) – বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে (metastasis)।

মেটাস্ট্যাসিসই অধিকাংশ ক্যান্সার মৃত্যুর প্রধান কারণ। যেমন, উরুর ক্ষত মাথায় ছড়ায় না; কিন্তু ফুসফুসের ক্যান্সার সহজেই যকৃতে ছড়াতে পারে।

ক্যান্সার: নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
ক্যান্সার কোনো বাহ্যিক শত্রু নয়; এটি আমাদের স্বাভাবিক কোষ থেকেই উৎপন্ন। স্তন ক্যান্সার আসে স্বাভাবিক স্তন কোষ থেকে, প্রোস্টেট ক্যান্সার স্বাভাবিক প্রোস্টেট কোষ থেকে। এটি যেন নিজের শরীরের ভেতরে বিদ্রোহ—নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

মূল প্রশ্ন হলো:
কেন কিছু মানুষের কিছু পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কোষ ক্যান্সার কোষে রূপান্তরিত হয়, আর অন্যদের ক্ষেত্রে হয় না?

প্রাচীন তত্ত্বসমূহ:

1. হিউমোরাল তত্ত্ব
প্রাচীন গ্রিকরা বিশ্বাস করতেন, দেহের চার রস—রক্ত, কফ, হলুদ পিত্ত ও কালো পিত্ত—এর ভারসাম্যহীনতা থেকেই রোগ হয়। ক্যান্সারকে মনে করা হতো অতিরিক্ত “কালো পিত্ত”-এর ফল। চিকিৎসা হিসেবে রক্তক্ষরণ, বমন ও জোলাপ দেওয়া হতো।
যদিও তত্ত্বটি ভুল ছিল, তবে তারা বুঝেছিলেন যে ক্যান্সার একটি সার্বিক (systemic) রোগ—শুধু স্থানীয় অস্ত্রোপচারে পুরোপুরি সারবে না। সেই যুগে অস্ত্রোপচার ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—অ্যানেস্থেসিয়া ও জীবাণুনাশক ছাড়া অপারেশনে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি ছিল।

2. লিম্ফ তত্ত্ব (১৭০০ সাল):
ধারণা করা হয়, স্থির লিম্ফের গাঁজন ও অবক্ষয় থেকে ক্যান্সার হয়। যদিও এটিও ভুল ছিল, তবে এতে বোঝা গিয়েছিল—
ক্যান্সার স্বাভাবিক কোষ থেকেই উৎপন্ন।
এটি লিম্ফ নালী ও লিম্ফ নোডের মাধ্যমে ছড়ায়।

3. আধুনিক যুগ: কোষতত্ত্ব:
মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কার ও টিস্যু রঞ্জন পদ্ধতির উন্নয়নে ১৮৩৮ সালে জার্মান প্যাথোলজিস্ট Johannes Müller প্রমাণ করেন, ক্যান্সার লিম্ফ নয়—কোষ থেকেই উৎপন্ন। একই বছরে Robert Carswell ধারণা দেন যে ক্যান্সার রক্তের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
এটি ছিল ক্যান্সার বোঝার প্রথম আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি—
ক্যান্সার হলো অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কোষবৃদ্ধির রোগ।
যদি সমস্যা অতিরিক্ত বৃদ্ধি হয়, তবে সমাধান—কোষ ধ্বংস করা। এই যুক্তি থেকেই এসেছে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি—যা আজও ক্যান্সার চিকিৎসার মূল ভিত্তি।

উপসংহার:
ক্যান্সার মানবজাতির প্রাচীনতম সঙ্গী—একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, যা আমাদের নিজেদের কোষ থেকেই জন্ম নেয়। হাজার বছরের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও এটি এখনও এক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ইতিহাস দেখায়, মানুষের জ্ঞান যেমন বিকশিত হয়েছে, তেমনি ক্যান্সার সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াও ক্রমশ গভীর হয়েছে।

যুদ্ধটি কঠিন—কারণ এটি বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, নিজের ভেতরের বিপথগামী কোষের বিরুদ্ধে।

ক্যান্সারকে হোমিওপ্যাথিক দৃষ্টিতে বিষয়টি একটু গুছিয়ে ও দর্শনভিত্তিকভাবে ব্যাখ্যা করছি।

ক্যান্সারকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় কীভাবে দেখা হয়?
হোমিওপ্যাথিতে ক্যান্সারকে শুধু একটি “টিউমার” বা “অস্বাভাবিক কোষবৃদ্ধি” হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটিকে ধরা হয়—
 জীবনীশক্তির (Vital Force) গভীর বিকৃতি।
দীর্ঘস্থায়ী মায়াজমিক (Chronic Miasmatic) বিকাশের চূড়ান্ত স্তর।
অভ্যন্তরীণ দমন (Suppression)-এর ফল।

১️। ক্যান্সার: একটি গভীর মায়াজমিক রোগ।
হোমিওপ্যাথির জনক Samuel Hahnemann দীর্ঘস্থায়ী রোগের মূল কারণ হিসেবে “মায়াজম” ধারণা দেন।

প্রধান তিনটি মায়াজম:
Psora (সোরিক)
Sycosis (সাইকোটিক)
Syphilis (সিফিলিটিক)

হোমিওপ্যাথিক দৃষ্টিতে ক্যান্সার সাধারণত:
 Syphilitic ধ্বংসাত্মক প্রকৃতি
Sycosis-এর অতিবৃদ্ধির প্রবণতা
Psora-এর দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি
এই তিনটির মিশ্র (Mixed Miasm) রূপে দেখা হয়।

অর্থাৎ ক্যান্সার হলো:
ধ্বংস + অতিবৃদ্ধি + দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ বিকৃতি।

২️। Suppression (দমন) তত্ত্ব।
হোমিওপ্যাথি মনে করে—
দীর্ঘদিন চর্মরোগ দমন।
মানসিক আঘাত দমন।
পুনঃপুন এন্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড ব্যবহার
হরমোনাল দমন।
এসবের ফলে রোগ ভেতরে সরে যায় এবং গভীর অঙ্গে আঘাত করে।

উদাহরণ:
একজিমা দমন → পরে অ্যাজমা → পরে টিউমার
(হোমিওপ্যাথিক ব্যাখ্যায় এটি ভিতরের দিকে রোগের গমন)

৩️। ক্যান্সার: Vital Force-এর বিকৃতি।
হোমিওপ্যাথির ভাষায়:
ক্যান্সার হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে জীবনীশক্তি (Vital Force) তার সুষম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে কোষ বৃদ্ধি আর স্বাভাবিক সীমায় থাকে না।

এখানে রোগ শুধু শারীরিক নয়—
মানসিক ও আবেগীয় স্তরও গভীরভাবে যুক্ত।
অনেক ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়:
দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্ট
অপমানবোধ
আত্মদমন
চেপে রাখা রাগ
অতিরিক্ত দায়িত্ববোধ
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ক্যান্সারকে কীভাবে দেখা হয়?

১️। টিউমার নয়, “ব্যক্তি” চিকিৎসা।
হোমিওপ্যাথিতে রোগের নাম নয়, রোগীর সম্পূর্ণ সত্তা (Totality of Symptoms) গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা নির্ধারণে দেখা হয়:
মানসিক লক্ষণ
শারীরিক জেনারেল (ঠান্ডা-গরম সহ্যশক্তি)
ক্ষুধা-পিপাসা
ঘাম
পারিবারিক ইতিহাস
দমন ইতিহাস
২️। Organ remedy বনাম Constitutional remedy
 Constitutional remedy
রোগীর সমগ্র ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী ওষুধ।
Organ remedy
ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ অনুযায়ী সহায়ক ওষুধ।

উদাহরণ (শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা, স্ব-চিকিৎসা নয়):
Conium (গ্রন্থি শক্ত, ধীরে বাড়ে)
Carcinosin (পারিবারিক ক্যান্সার ইতিহাস, অতিরিক্ত দায়িত্ববোধ)
Phytolacca (স্তন গ্রন্থি)
Thuja (সাইকোটিক অতিবৃদ্ধি)
Nitric acid (ধ্বংসাত্মক ক্ষত)
Hydrastis (ক্ষয়প্রবণতা)

বাস্তবে রোগীভেদে সম্পূর্ণ আলাদা প্রেসক্রিপশন হতে পারে।

৩️। ক্যান্সার: স্থানীয় না সার্বিক?
আধুনিক চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে ক্যান্সারকে কোষবৃদ্ধির রোগ হিসেবে দেখে।
হোমিওপ্যাথি এটিকে দেখে:
সার্বিক জীবনীশক্তির ব্যাঘাত
 গভীর মায়াজমিক অবক্ষয়
 দীর্ঘদিনের রোগপ্রবণতার বহিঃপ্রকাশ

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
 ক্যান্সার একটি জীবনসংকটাপন্ন রোগ।
 শুধুমাত্র হোমিওপ্যাথির উপর নির্ভর করে আধুনিক চিকিৎসা বাদ দেওয়া বিপজ্জনক।
 ইন্টিগ্রেটিভ পদ্ধতি (Oncology + Supportive Homeopathy) তুলনামূলক নিরাপদ পন্থা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ
হোমিওপ্যাথিক দর্শনে ক্যান্সার হলো:
“সত্তার ভিতরে দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্যের চূড়ান্ত প্রকাশ”
এটি যেন:
দমিত আবেগের গোপন বিস্ফোরণ
জীবনীশক্তির দিকভ্রষ্ট বৃদ্ধি
সুষমা হারানোর পরিণতি

কাজী সাইফ উদদীন আহমেদ 
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক 
>Share by:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন


Make a comments as guest/by name or from your facebook:


Make a comment by facebook:
নবীনতর পূর্বতন