পীড়ার প্রকৃত নিদান: অর্গাননের আলোকে হোমিওপ্যাথিক দর্শন, লক্ষণসমষ্টি ও ঔষধ নির্বাচন"
রোগের প্রকৃত কারণ বাহিরে নয়, ভিতরে; বাহ্যিক কারণ কেবল উত্তেজক (Exciting Cause), আর চিকিৎসার ভিত্তি হলো রোগীর সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টি (Totality of Symptoms)। এই ধারণা দিয়াছেনন ডা. Samuel Hahnemann-এর অর্গানন অব মেডিসিন নামক এক মৌলিক নীতির বইতে।
১. বাহ্যিক কারণ প্রকৃত রোগের মূল কারণ নয়।
হ্যানিম্যান বলেন, রোগের প্রকৃত উৎপত্তি জীবনীশক্তির (Vital Force) গতিশীল (Dynamic) বিকৃতির ফলে হয়। বাহ্যিক কারণ যেমন—
ম্যালেরিয়ার জীবাণু,
আবহাওয়া,
দূষিত জল,
মশা,
খাদ্যাভ্যাস,
এসব রোগ সৃষ্টির উত্তেজক কারণ (Exciting Cause) মাত্র।
অর্গানন সমর্থন,
এফোরিজম ৫-এ হ্যানিম্যান বলেছেন—
চিকিৎসককে রোগের সম্ভাব্য উত্তেজক ও রক্ষণকারী কারণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে; কিন্তু এগুলো রোগের প্রকৃত স্বরূপ নয়।
অতএব, একই পরিবেশে সবাই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় না, কারণ প্রত্যেকের অভ্যন্তরীণ গ্রহণক্ষমতা (Susceptibility) এক নয়।
২. প্রকৃত রোগ ভিতরে—জীবনীশক্তির বিকৃতিতে।
হোমিওপ্যাথি মতে রোগ প্রথমে দেহে নয়, জীবনীশক্তিতে (Vital Force) আঘাত করে। পরে তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে লক্ষণ দেখা দেয়।
অর্গানন সমর্থন
এফোরিজম ১১
সকল প্রাকৃতিক রোগ জীবনীশক্তির গতিশীল বিকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়।
অতএব—
জীবাণু রোগের একমাত্র কারণ নয়;
জীবনীশক্তির গ্রহণক্ষমতা না থাকলে বাহ্যিক কারণ রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।
৩. রোগের নাম নয়, লক্ষণসমষ্টিই চিকিৎসার ভিত্তি।
একজন এলোপ্যাথ জানেন—এটি ম্যালেরিয়া জ্বর, তাই কুইনাইন দিবেন।
কিন্তু একজন হোমিওপ্যাথ জানেন—
রোগীর লক্ষণ যদি জেলসিমিয়ামের (Gelsemium) সঙ্গে মিলে যায়, তবে রোগের নাম যাই হোক, জেলসিমিয়ামই প্রয়োগ করতে হবে।
অর্গানন সমর্থন
এফোরিজম ৬
চিকিৎসক রোগের নাম নয়, কেবল লক্ষণসমষ্টির মাধ্যমেই রোগকে জানতে পারেন।
এবং,
এফোরিজম ১৮
রোগের সমস্ত লক্ষণসমষ্টিই একমাত্র নির্দেশক, যা দ্বারা ঔষধ নির্বাচন করতে হবে।
৪. রোগের নাম জানা সবসময় চিকিৎসায় সহায়ক নয়।
হোমিওপ্যাথির প্রশ্ন—
এটি ম্যালেরিয়া জ্বর?
বসন্ত জ্বর?
দুর্ভিক্ষ জ্বর?
এসব জানা চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য নয়।
কারণ—
ঔষধ নির্বাচন হবে রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী, রোগের নাম অনুযায়ী নয়।
অর্গানন সমর্থন
এফোরিজম ৭
যখন উত্তেজক কারণ অপসারণযোগ্য নয়, তখন অবশিষ্ট লক্ষণসমষ্টিই চিকিৎসার একমাত্র নির্দেশক।
৫. উত্তেজক কারণের জ্ঞান সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় নয়।
হ্যানিম্যান কখনও বাহ্যিক কারণকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি।
যেমন—
রাত জাগা,
ঠাণ্ডা লাগা,
অতিভোজন,
দুঃখ,
আর্দ্রতা,
অনিয়ম,
এসব রোগের উত্তেজক বা রক্ষণকারী কারণ হতে পারে।
অর্গানন সমর্থন
এফোরিজম ৫ ও ৭
চিকিৎসকের কর্তব্য—
১. উত্তেজক কারণ চিনতে পারা;
২. সম্ভব হলে তা দূর করা;
৩. এরপর লক্ষণসমষ্টির ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন করা।
৬. রোগ বারবার ফিরে এলে গভীর মায়াজম চিনতে হবে।
জেলসিমিয়াম প্রয়োগে জ্বর সাময়িক ভালো হলেও পুনরায় ফিরে এলে বুঝতে হবে—
সোরা (Psora),
সাইকোসিস (Sycosis),
সিফিলিস (Syphilis)
প্রভৃতি গভীর মায়াজম (Miasm) অন্তর্নিহিত অবস্থায় রয়েছে।
অর্গানন সমর্থন
এফোরিজম ৭৮ - ৮১
হ্যানিম্যান বলেন—
অধিকাংশ দীর্ঘস্থায়ী রোগের পেছনে গভীর মিয়াজম কার্যকর থাকে।
তাই শুধু তাত্ক্ষণিক লক্ষণ দূর করলেই স্থায়ী আরোগ্য আসে না; অন্তর্নিহিত মিয়াজমের প্রতিকার প্রয়োজন।
৭. কারণ একটি লক্ষণ মাত্র
যেমন—
ঠাণ্ডা লাগার পরে সর্দি,
রাত জাগার পরে ডায়রিয়া,
ভিজে যাওয়ার পরে শরীর ব্যথা।
এখানে "ঠাণ্ডা লাগা" বা "রাত জাগা" নিজে ঔষধ নির্দেশ করে না।
বরং—
এগুলো রোগীর সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টির একটি অংশমাত্র।
অর্গানন সমর্থন
এফোরিজম ১৮
সম্পূর্ণ লক্ষণসমষ্টিই ঔষধ নির্বাচনের একমাত্র পথপ্রদর্শক।
নোট : সকল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক এবং ছাত্রছাত্রীদের কে জানাচ্ছি, দয়া করে আপনারা সম্পূর্ণ কেইস টেকিং গ্রহণ করিবেন রোগীদের কাছ থেকে। কারন অচির রোগ - ক্রনিক রোগের উপর দাঁড়ানো থাকে, যার কারনে রোগীর অচির রোগ সমূহ ভালো হয়েও ভালো হতে চায় না এবং অসম্পূর্ণ কেস টেকিং থেকে মায়াজম ভিত্তিক এবং কনস্টিটিউশনাল ওষুধ নির্বাচন করা যায় না।
প্রকৃত হোমিওপ্যাথির তিনটি মৌলিক স্তম্ভ।
১. সমঃ সমঃ শময়তি (Similia Similibus Curentur)
এফোরিজম ২৬
সদৃশ দ্বারা সদৃশ রোগ নিরাময় হয়।
২. স্বল্পতম বা সূক্ষ্মতম মাত্রা (Minimum Dose)
এফোরিজম ২৭৫ - ২৭৮
রোগীকে আরোগ্য করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি ঔষধ কখনও দেওয়া উচিত নয়।
৩. একই সময়ে একটি মাত্র ঔষধ (Single Remedy)
এফোরিজম ২৭৩
একই সময়ে একটিমাত্র সরল, একক ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত।
উপসংহার
প্রকৃত হোমিওপ্যাথির দৃষ্টিতে—
রোগের নাম নয়, রোগীর লক্ষণই প্রধান।
বাহ্যিক কারণ নয়, জীবনীশক্তির অভ্যন্তরীণ বিকৃতিই প্রকৃত রোগ।
উত্তেজক কারণ জানা উপকারী, কিন্তু ঔষধ নির্বাচনের ভিত্তি নয়।
পুনঃপুনঃ রোগপ্রত্যাবর্তনে গভীর মিয়াজম অনুসন্ধান করতে হবে।
চিকিৎসার মূলনীতি হলো— (১) Similia, (২) Minimum Dose, (৩) Single Remedy।
এই তিন নীতির উপরই হ্যানিম্যানের অর্গানন অব মেডিসিন-এর প্রকৃত হোমিওপ্যাথিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত।
কাজী সাইফ উদদীন আহমেদ
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক
>Share by:
Make a comments as guest/by name or from your facebook:
Make a comment by facebook: