ডিপথেরিনাম
(Diptherinum)
(নোসোড)
সংগ্রহ : ডাক্তার নীল মনি ঘটকের মেটেরিয়া মেডিকা বই থেকে।
ডিপথেরিনাম- একটি নোসোড জাতীয় ঔষধ। প্রত্যেক নোসোড জাতীয় ঔষধই গভীরভাবে কার্য করিয়া থাকে। যদিও অন্যান্য নোসোডগুলির মধ্যে অনেকগুলিই রীতিমত প্রুভিং- এর দ্বারা ব্যবহারোপযোগী হইয়াছে, কিন্তু ডিপথেরিনাম সেইরূপ প্রুভিং না হওয়ায় কেবল রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার (Clinical) হইবার ফলে, যে সকল লক্ষণ থাকিলে ইহা আরোগ্য করিতে পারে বলিয়া পরিদৃষ্ট হইয়াছে, সেই লক্ষণের সমষ্টি ধরিয়াই ব্যবহার হইয়া থাকে।
যে সকল রোগীর শরীর সোরাদি দোষের প্রভাবে দুর্বল এবং নানা পীড়া প্রবণ,
নোট : বিশেষতঃ গলদেশের ও সর্দি প্রভৃতি শ্বাসযন্ত্রের পীড়া প্রায়ই হইয়া থাকে, তাহাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই ইহার ব্যবহার হইতে পারে।
উপযোগী ক্ষেত্র : যাহাদের জীবনীশক্তি অতিশয় ক্ষীণ, ডিপথেরিয়া পীড়ায় আক্রান্ত হইবার প্রবণতা অধিক এবং যে কোনও পীড়া হইলে, যাহাদের প্রায়ই সাংঘাতিক অবস্থা আসিয়া পড়ে তাহারাই এই ঔষধের উপযোগী ক্ষেত্র।
ডিপথেরিয়া (Diptherial) - এই ঔষধটি ডিপথেরিয়া পরে পক্ষাঘাত ও মেরুমজ্জার উত্তেজনা প্রভৃতি পীড়ায় ব্যবহৃত হইতে পারে, যদি ইহার বিশিষ্টতা থাকে।
ইহার বিশিষ্টতা কি?
বিশিষ্টতা ও যোগ্যস্থল হল : ডিথপথেরিনামের এই পীড়ায় বিশিষ্টতা এই যে, রোগী অতিশয় দুর্বল, ঘোর আচ্ছন্ন এবং যেন ঘুমঘোরের অবস্থায় পড়িয়া থাকে। কিছুই চায় না, তবে ডাকিলে উত্তর দেয়, জ্বরত থাকেই না, বরং শারীরিক তাপ স্বাভাবিক অপেক্ষা কিছু কম এবং অন্যান্য কোনও ঔষধের স্পষ্ট লক্ষণ বা বিশিষ্টতা থাকে না - এই অবস্থাটি ডিপথেরিনাম ব্যবহার হইবার যোগ্যস্থল।
এই ঔষধটির ব্যক্তিগত লক্ষণ (Subjective) বড় একটা থাকে না,
কেবল স্থানীয় ও উপরোক্ত লক্ষণ এবং অবস্থা (Objective symptoms and condition) দেখা যায়।
রোগীর টনসিল ও চারিদিকের গ্ল্যান্ডগুলি বড় হয় ও বেদনান্বিত হইয়া উঠে এবং
মুখগহ্বর হইতে ও নাসাপথ হইতে যা কিছু স্রাব বাহির হয়, সে সবই অতি দুর্গন্ধ।
তাহা ছাড়া অন্য দ্রব্য গিলিবার সময় কষ্ট বড় থাকে না এবং গিলিতে পারে, কিন্তু তরল পানীয় দ্রব্যগুলি নাসাপথে বাহির হইয়া পড়ে।
রোগীর 'নিঃশ্বাসেও অতিশয় দুর্গন্ধ বাহির হয়।
আরও এক কথা, ডিপথেরিয়ার ক্ষেত্রে, অন্য সুনির্বাচিত ঔষধে ফল না হইলে, অনেক ক্ষেত্রে ডিপথেরিনাম আরোগ্য করিতে সক্ষম হয়।
ডিপথেরিনামের নাসা পথে রক্তস্রাবও আছে।
এই ঔষধটি ব্যবহার করিবার ক্ষেত্র অতি কমই পাওয়া যায় এবং তাহাই বাঞ্জনীয়।
শক্তি- ২০০ হইতে ৫০ এম পর্যন্ত ব্যবহার করিয়াছি। ২০০ অপেক্ষা নিম্নতর শক্তি ব্যবহার না করাই সঙ্গত।
ডিপথেরিয়া রোগের
রোগীতত্ত্ব এবং রোগীলিপি।
Pathology and clinical history of diphtheria
রোগীতত্ত্ব- ডিপথেরিয়ার পর পক্ষাঘাতের একটি রোগীর বিষয় এখানে বর্ণনা করিতেছি, এই রোগীটির জীবনের কোনও আশাই ছিল না, নিতান্তই ভগবানের কৃপায় ডিপথেরিনামের দ্বারা আরোগ্য হইয়াছিল।
নাম : শ্রীমান নিমাইচরণ দত্ত, কলিকাতার কোনও ধনাঢ্য পরিবারস্থ একটি বালক,
বয়স : ১৩/১৪ বৎসর হইবে।
একদিন স্কুলে যাইতে যাইতে হঠাৎ শীতানুভবসহ সামান্য জ্বর ও তৎসহ দুর্দমনীয় কাশির বেগ হইতে থাকে। ছেলেটি স্কুলে না গিয়া বাড়ীতে ফিরিয়া আসে, সন্ধ্যার প্রাক্কালে দেখা গেল যে তাহার গালগলা ফুলিয়াছে এবং গলাধঃকরণে কষ্ট হইতেছে ও রোগীর মধ্যে মধ্যে চমক দিয়া উঠিতেছে। ছেলেটির প্রায়ই নানা প্রকারের অসুখাদি হইত বলিয়া উহার ডাক নাম 'পচা' ছিল।
অতীত রোগ : প্রায়ই নানা প্রকারের অসুখাদি হইত।
যাহা হউক পরিবারস্থ সকলে ভীত হইয়া উঠিল এবং কোনও উচ্চাঙ্গের এলোপ্যাথিক চিকিৎসক, যিনি ঐ পরিবারের স্থায়ী চিকিৎসকরূপে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁহাকেই আনা হইল।
এলোপ্যাথিক চিকিৎসক আসিয়া গলার উপর একটি এন্টিফুজিষ্টিনের পটি প্রয়োগ করিলেন এবং যথারীতি ইঞ্জেকসন দিলেন। ফলতঃ তাহার চিকিৎসায় ছেলেটির কষ্ট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হইতে থাকায় শহরের আরও একজন উচ্চাঙ্গের এলোপ্যাথিক চিকিৎসক আনিত হন এবং একাদশ দিনের পর প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় উপস্থিত হইলে তাঁহারা "আশা নাই" বলিয়া জবাব দেন।.
দ্বাদশ দিনের প্রাতঃকালে আমি ডা. নীলমনি ঘটক, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, আহুত হই এবং উপরোক্ত চিকিৎসকগণ আসিয়া রোগীর পূর্বাহিতাস ও প্রথম হইতে যে সকল লক্ষণ এবং অবস্থা প্রকাশিত হইয়াছিল এবং তাঁহারা যেভাবে চিকিৎসা করিয়াছিলেন সে সকলের বিশদ আমাকে প্রদান করেন। আমি নিম্নলিখিত অবস্থা ও লক্ষণ প্রাপ্ত হইয়াছিলাম।
শারীরিক তাপ ৯৬.৭০, বৈকালের দিকে ৯৬° পর্যন্ত,
রোগী ঘোর অচৈতন্য ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়া আছে,
ডাকিলে কেবল করুণ নেত্রে আমার দিকে চাহিয়া দেখে,
কিন্তু কথা বলিতে অপারক,
রোগীর মুখগহ্বর ও নিঃশ্বাস হইতে এত দুর্গন্ধ বাহির হইতেছিল যে, নিকটস্থ হইয়া কাহারও বসিবার উপায় ছিল না।
এলোপ্যাথিক চিকিৎসক ডাক্তারবাবু রোগীর গলার ভিতর গ্যাংগ্রিন হইয়াছে বলিয়া মতামত প্রকাশ করিলেন।
রোগী গত চারদিন হইতে বাহ্যে প্রস্রাব করিতেছে না, ক্যাথিটার দিয়া স্রাব করান হইতেছে, তাহাও সন্তোষজনক নয়।
ডুস দিয়া মল নিঃসরণ করা বড়ই বিপজ্জনক, যেহেতু দুইবার ডুস দিবার পর অন্ত্র হইতে ডুসের জল বাহির না হইয়া রোগীর নিরতিশয় শ্বাসকষ্ট উপস্থিত হয় এবং মৃত্যু আসন্ন হইয়া পড়ে,
এজন্য গতকাল হইতে ডুস দিবার চেষ্টা রহিত করা হইয়াছে, রোগীর কোমর হইতে নিম্নাঙ্গে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, নড়িতেও পারে না এবং চিমটি দিলেও লাগে না।
আহার করানো অতিশয় কষ্টকর। কেননা অধিকাংশ আহার দ্রব্য নাসাপথে বাহির হইয়া যায় এবং তাহাতে রোগীর কেবল কষ্ট দেওয়া হয় মাত্র।
এই প্রকার শোচনীয় অবস্থা অবলোকন করিয়া, আমার আর একটি চিকিৎসক বন্ধু যিনি আমার সহিত এই রোগটি দেখিবার জন্য গিয়াছিলেন, তিনি আমাকে ডিপথেরিনাম প্রয়োগ করিবার জন্য বলেন, আমিও তাঁহার সহিত একমত হইয়া ডিপথেরিনাম প্রয়োগই যে সমীচীন হইবে এবং তদ্ব্যতীত অন্য কোনও ঔষধই এই স্থলে প্রয়োগ করা বিধেয় নহে, তাহা স্থির করিলাম।
এক্ষণে কোন শক্তি প্রয়োগ করা হইবে, ইহাই সমস্যা হইয়া উঠিল, যেহেতু নোসোড জাতীয় ঔষধ ডিপথেরিনাম ২০০ শক্তির কমে ভাল ফল দেয় না এবং বর্তমান ক্ষেত্রে, কি জানি হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি হইয়া রোগীর জীবন শেষ করিয়া ফেলে এই ভয়ে অনেক দ্বিধা হইতে লাগিল। যাহা হউক সাহসের উপর ভর করিয়া ডিপথেরিনাম ২০০ শক্তির ২/৫টি অনুবটিকা দুই আউন্স জলে দিয়া সেই ঔষধ অল্প পরিমাণে প্রতি ৩ ঘন্টা অন্তর দুই মাএা প্রয়োগের ব্যবস্থা হইল এবং
দ্বিতীয় মাত্রা হইতে চারবার করিয়া নাড়া দিয়া প্রয়োগ করিবার ব্যবস্থা রহিল। এইভাবে ছয় মাত্রা দিবার পর, রোগীকে যেন একটু 'হালু চালু' বোধ হইতেছে বলিয়া পরদিন (তেরদশ দিবসে) সংবাদ পাইলাম।
গিয়া দেখিলাম বাস্তবিক তাহাই বটে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত পাগুলি ঈষৎ সঞ্চালিত হইতেছে এবং আমাদের সমক্ষে প্রচুর দুর্গন্ধ মল এবং তৎসঙ্গে অনেকখানি প্রস্রাব অসাড়ে করিয়া ফেলে। ঔষধের মাত্রা ঐ ভাবে দিবার ব্যবস্থা রহিত করা হইল,।
পঞ্চদশ দিবসে বৈকালে গিয়া দেখা গেল, রোগী অনেকটা ভাল আছে, গলার ভিতরে বেদনা ও নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ যথেষ্টই রহিয়াছে, কখনও বা দুগ্ধাদি, পানীয় নাসাপথে এখনও বাহির হইয়া থাকে, তবে অধিকাংশ বার তাহা হয় না, বাহ্যে প্রস্রাব সরল হইয়াছে, রোগীর ঘোর অচৈতন্য ভাবের অনেক পরিবর্তন হইয়াছে, নাড়ী ও অনেকটা ভাল।
এলোপ্যাথিক চিকিৎসক বন্ধুগণ এক বাক্যে স্বীকার করিলেন যে, হোমিওপ্যাথিক ঔষধের মন্ত্রবৎক্রিয়া ইহাকে বলা যায়, রোগীর গাত্রতাপ পূর্বের ন্যায়ই ছিল, আমরা সমস্ত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া ডিপথেরিনাম ১০০০ শক্তি একটি মাত্রা প্রয়োগ করি, 'আর কোনও ঔষধ দিবার প্রয়োজন হয় নাই।
বিংশতি দিবসে রোগীর মুসুরের ডাল ও পুরাতন দাদখানি চাউল একত্রে পাক করিয়া বিশেষ দ্রব্য হইলে সামান্য লবণ সহযোগে 'আহার করিতে দেওয়া হয়। এবং
পঞ্চবিংশতি দিবসে অন্ন পথ্য প্রদান করা হয়। নিতান্ত মরণের মুখ হইতে ভগবৎ কৃপায় এই রোগীকে আরোগ্য করিবার উপলক্ষ্য হইয়াছিলাম বলিয়া ঐ গৃহস্থে আমরা বিশেষ সমাদর লাভ করিয়াছিলাম।
সংগ্রহ : ডাক্তার নীল মনি ঘটকের মেটেরিয়া মেডিকা বই থেকে।
Materia Medica by William Boericke
DIPHTHERINUM (ডিফথেরিনাম)
উৎস: শক্তিকৃত (Potentized) ডিফথেরিয়ার জীবাণু বা ডিফথেরিটিক ভাইরাসজাত নোসোড।
হোমিওপ্যাথিতে এটি একটি Nosode হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ রোগজাত পদার্থ থেকে প্রস্তুত ওষুধ।
বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা
"Adapted to patients prone to catarrhal affections of respiratory organs, scrofulous individuals."
অনুবাদ:
যেসব রোগী বারবার শ্বাসযন্ত্রের ক্যাটারহাল (শ্লেষ্মাজনিত প্রদাহ) সমস্যায় ভোগেন এবং যাদের স্ক্রোফুলাস (Scrofulous) প্রবণতা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ উপযোগী হতে পারে।
ব্যাখ্যা:
ঘন ঘন সর্দি-কাশি, টনসিলাইটিস, গলা বসে যাওয়া, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি হয়।
স্ক্রোফুলাস বলতে সাধারণত দুর্বল গঠন, লসিকাগ্রন্থি ফোলা, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণপ্রবণ সংবিধানকে বোঝায়।
"Diphtheria, laryngeal diphtheria, post-diphtheritic paralysis."
অনুবাদ:
ডিফথেরিয়া, স্বরযন্ত্রের ডিফথেরিয়া (Laryngeal diphtheria) এবং ডিফথেরিয়া-পরবর্তী পক্ষাঘাতের অবস্থায় এটি বিবেচিত হতে পারে।
ব্যাখ্যা:
ডিফথেরিয়ার সময় গলায় ছদ্মঝিল্লি (membrane) তৈরি হয়।
রোগ সেরে যাওয়ার পর কখনও তালু, গলবিল বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে; এমন অবস্থায় কিছু হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ডিফথেরিনাম ব্যবহার করেন।
"Malignancy from the start."
অনুবাদ:
রোগের শুরু থেকেই অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর ও মারাত্মক প্রকৃতির হয়।
ব্যাখ্যা:
রোগ দ্রুত অবনতি হয়।
টক্সেমিয়া ও শক্তিক্ষয় দ্রুত দেখা দেয়।
রোগীর চেহারায় শুরু থেকেই আশঙ্কাজনক অবস্থা প্রকাশ পায়।
"Glands swollen; tongue red, swollen; breath and discharge very offensive."
অনুবাদ:
গ্রন্থিসমূহ (বিশেষত ঘাড়ের লসিকাগ্রন্থি) ফোলা থাকে; জিহ্বা লাল ও স্ফীত হয়; নিঃশ্বাস এবং বিভিন্ন নিঃসরণ অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত হয়।
ব্যাখ্যা:
ঘাড়ের গ্রন্থি ফুলে যায়।
জিহ্বা মোটা, লাল ও ফুলে থাকে।
মুখের দুর্গন্ধ খুব বেশি থাকে।
নাক বা গলার স্রাব পচা গন্ধযুক্ত হতে পারে।
"Diphtheritic; membrane thick, dark."
অনুবাদ:
ডিফথেরিয়াজনিত ঝিল্লি (membrane) পুরু এবং গাঢ় বর্ণের হয়।
ব্যাখ্যা:
গলায় ধূসর, কালচে বা বাদামী পুরু আবরণ দেখা যায়।
এটি গুরুতর ডিফথেরিয়ার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
"Epistaxis; profound prostration."
অনুবাদ:
নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে; রোগী অত্যন্ত অবসন্ন ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে।
ব্যাখ্যা:
সামান্য নড়াচড়াতেও ক্লান্তি।
বিছানা থেকে উঠতে অনিচ্ছা।
নাক থেকে রক্তপাত হতে পারে।
"Swallows without pain, but fluids are vomited or returned by the nose."
অনুবাদ:
রোগী ব্যথা ছাড়াই গিলতে পারে, কিন্তু তরল পদার্থ খাওয়ার পর তা বমি হয়ে বের হয়ে আসে অথবা নাক দিয়ে ফিরে আসে।
ব্যাখ্যা:
এটি ডিফথেরিয়া-পরবর্তী তালুর পক্ষাঘাতের (Palatal paralysis) একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
পানি বা তরল খাবার গিললে তা নাক দিয়ে বেরিয়ে আসে।
গিলতে খুব বেশি ব্যথা নাও থাকতে পারে।
নরম তালুর পেশী দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে এই উপসর্গ দেখা দেয়।
সম্পর্ক (Relationship)
"Compare: Diphtherotoxin (Cahis)."
অনুবাদ:
Diphtherotoxin ওষুধটির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
Diphtherotoxin-এর প্রয়োগক্ষেত্র:
দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিসে, যেখানে বুকে রেলস (rales) শোনা যায়।
Cartier বয়স্কদের ভেগো-প্যারালাইটিক ব্রংকাইটিসে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
ইনফ্লুয়েঞ্জা (Grippe)-পরবর্তী বিষক্রিয়াজনিত ব্রংকাইটিসেও এটি বিবেচ্য।
মাত্রা (Dose)
"Thirtieth, two hundredth or C.M potency. Must not be repeated too frequently."
অনুবাদ:
৩০ শক্তি (30C), ২০০ শক্তি (200C) অথবা সি.এম. (CM) শক্তিতে ব্যবহার করা হয়। এটি খুব ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।
ব্যাখ্যা:
ডিফথেরিনাম একটি নোসোড হওয়ায় অধিকাংশ অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক বারবার ডোজ দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকেন।
রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, লক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে ডোজ নির্ধারণ করা হয়।
ডিফথেরিনামের প্রধান লক্ষণসমূহ (সংক্ষেপে)
বারবার শ্বাসযন্ত্রের ক্যাটারহাল সংক্রমণ।
ডিফথেরিয়া বা ডিফথেরিয়া-পরবর্তী জটিলতা।
রোগের শুরু থেকেই মারাত্মক অবস্থা।
ঘাড়ের গ্রন্থি ফোলা।
জিহ্বা লাল ও স্ফীত।
মুখ ও স্রাবে তীব্র দুর্গন্ধ।
গলায় পুরু, কালচে ডিফথেরিটিক ঝিল্লি।
নাক দিয়ে রক্ত পড়া।
প্রচণ্ড অবসাদ ও শক্তিহীনতা।
তরল গিললে নাক দিয়ে ফিরে আসা (তালুর পক্ষাঘাতের ইঙ্গিত)।
গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য
ডিফথেরিয়া একটি জরুরি চিকিৎসাযোগ্য সংক্রামক রোগ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর জন্য ডিফথেরিয়া অ্যান্টিটক্সিন এবং অ্যান্টিবায়োটিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসকষ্ট, গলায় ঝিল্লি, জ্বর বা ডিফথেরিয়ার সন্দেহ হলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এই জরুরি ব্যবস্থাগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়।
ডাক্তার এস সি এলেন, এম ডি, বলেন, তার কী নোট অফ মেটিরিয়া মেডিকা তে,
যখন প্রথমেই, রোগীকে দেখে তার জীবন বিপন্ন মনে হয় ও সুনির্বাচিত শুরুষে উপশম বা স্থায়ী উন্নতি হয় না তখন ব্যবহার্য।
উপরের লক্ষণগুলো আরোগ্যকারী লক্ষণ ও লেখক ঐগুলো দীর্ঘ 25 বৎসর যাবৎ নির্দেশক ও নির্ভরযোগ্য লক্ষণ হতে দেখেছেন।
এই ওষুধটি অন্যান্য নোসোড ও জৈববিষের মত হোমিও ফার্মাকোপিয়া' অনুযায়ী প্রস্তুত এবং অন্য হোমিও ওষুধের মত নিরাপদে রোগীকে দেওয়া যায়।
অন্য সব নোসোডের 30 শক্তির নীচে ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই।
200 শক্তি হতে উচ্চতর শক্তি এম বা সি. এম (একলক্ষ) শক্তিতে এরা আরোগ্যদায়ী শক্তি বাড়ে।
এই ওষুধ ঘনঘন দেওয়ার প্রয়োজন নেই বা উচিতও নয়। অশক্তিকৃত এন্টি-টক্সিনের মত এই ওষুধ প্রতি রোগীকে আরোগ্য করবে, তারপর প্রয়োগ করাও যেমন সহজ ও তেমনি এর দ্বারা কোনরকম বিপদজনক কুফল হবার সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া এ সম্পূর্ণ হোমিওপ্যাথিক।
লেখক এই ওষুধ 25 বৎসর যাবৎ প্রতিষেধক রূপে ব্যবহার করে আসছেন ও ওষুধ দেওয়ার পর ঐ পরিবারে কোন দ্বিতীয় ব্যক্তি ডিথেরিয়ার আক্রান্ত হন নাই। চিকিৎসক সমাজ এই ওষুধ প্রয়োগে ব্যর্থ হলে লিখে জানাবেন - এইচ সি এলেন।
ডিপথিরিয়া (Diphtheria) রোগে গলায় যে বিশেষ ধরনের পর্দা বা ঝিল্লী তৈরি হয়, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সিউডোমেমব্রেন (Pseudomembrane) বলা হয়। এটি সাধারণত টনসিল, গলবিল (Pharynx) বা কণ্ঠনালীর চারপাশে লেগে থাকে।
নিচে ডিপথিরিয়ার এই বিশেষ লক্ষণের চিত্র এবং এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো:
ডিপথিরিয়া ঝিল্লীর চিত্র ও দৃশ্যমান রূপ
ডিপথিরিয়া আক্রান্ত রোগীর গলার ভেতরের অবস্থা দেখতে নিচের মতো হয়ে থাকে:
- রঙ: এটি সাধারণত গাঢ় ছাইরঙা (Grey), ময়লা সাদা বা কালচে বাদামী রঙের হয়ে থাকে।
- পুরুত্ব: ঝিল্লীটি বেশ পুরু ও শক্ত লেপ বা আস্তরণের মতো গলার ভেতরের দেয়ালে সেঁটে থাকে।
- অবস্থান: এটি টনসিল ও তালুর নরম অংশকে (Soft palate) ঢেকে ফেলে।
(ডিপথিরিয়ার বাস্তব ক্লিনিক্যাল ছবি দেখতে এবং এর লক্ষণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আপনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার WHO Diphtheria Fact Sheet অথবা যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের CDC Diphtheria Clinical Features পাতাটি ঘুরে দেখতে পারেন।)
এই ঝিল্লীর ৪টি প্রধান বৈশিষ্ট্য
- রক্তপাত হওয়া: এই আস্তরণটি গলার টিস্যুর সাথে এত শক্তভাবে লেগে থাকে যে, এটি জোর করে তোলার চেষ্টা করলে কসরত করা জায়গা থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়।
- শ্বাসকষ্ট: ঝিল্লীটি আকারে বড় হয়ে একপর্যায়ে শ্বাসনালী বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে রোগীর শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হয় এবং অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়।
- ঘাড় ফুলে যাওয়া: গলার লসিকা গ্রন্থি (Lymph nodes) ফুলে যাওয়ার কারণে রোগীর ঘাড়টি দেখতে ষাঁড়ের ঘাড়ের মতো মোটা লাগে, যাকে চিকিৎসকরা "Bull Neck" বলেন।
- তীব্র টক্সিন নিঃসরণ: এই ঝিল্লীর ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়া এক ধরনের মারাত্মক বিষ (Toxin) তৈরি করে, যা রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে হৃৎপিণ্ড এবং স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
কাজী সাইফ উদদীন আহমেদ
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক
>Share by:

Make a comments as guest/by name or from your facebook:
Make a comment by facebook: